একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় মানবিক সংকট- রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ উঠে আসছে। এরই মধ্যে শহরে রোহিঙ্গাদের দৌরাত্ম বৃদ্ধির অভিযোগের পাশাপাশি সামনে এসেছে হাফেজ হাশেম নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
নিজেকে ‘দারুল আমান ট্রাস্ট’-এর ফাইন্যান্স সেক্রেটারি ও পরিচালক পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আর্থিক আত্মসাৎ, ভুয়া তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) গ্রহণ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়া এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোহাম্মদ উল্লাহর পুত্র পরিচয় দেওয়া হাফেজ হাশেমের নামে রয়েছে দুটি ভিন্ন জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)। একটি নম্বর ১৫১৮৬৬৬২১৭৬১৯ এবং অপরটি ৭৮০১৩৯১৩৪৮। দুই পরিচয়পত্রেই ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে জঙ্গল সলিমপুর, ডাকঘর জাফরাবাদ, উপজেলা সীতাকুণ্ড উপজেলা, জেলা চট্টগ্রাম। উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধী চক্র ও অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে আলোচিত। রহস্যজনকভাবে তার কোনো এনআইডিতেই নির্দিষ্ট হোল্ডিং বা বাসার নম্বর নেই। স্থানীয়দের দাবি, হাশেম মূলত একজন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী, যিনি ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বাংলাদেশি নাগরিক সেজেছেন।
ঠিকানা চট্টগ্রামে হলেও হাশেম দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার সদর উপজেলা এলাকায় বসবাস করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজারের দক্ষিণ রুমালিরছড়া এলাকায় অবস্থিত ‘দারুল আমান’ নামের একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানকে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি স্থানীয় দৈনিক দৈনিক কক্সবাজার-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে বহু রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিক বানানোর ‘কারখানা’ হিসেবে ব্যবহার করছেন- যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিগত সময়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের অভিযোগে ২১ মার্চ ২০১৩ সালে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা এলাকায় এক মাদ্রাসায় গোপন বৈঠক চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন হাফেজ সালা উল ইসলাম (৫৪)। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ওই সময় হাফেজ হাশেমের নামও আলোচনায় আসে। যদিও তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা বা অভিযোগ গঠন হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠানে বাংলা কারিকুলামে রোহিঙ্গাদের পড়াশোনার সুযোগ দিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চলছে।
দারুল আমান ট্রাস্টের ফাইন্যান্স সেক্রেটারি পদে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকলেও হাশেম প্রতিষ্ঠানের কোনো আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাস্ট বোর্ডের এক সদস্য বলেন, “বোর্ড মিটিংয়ে বারবার হাফেজ হাশেমকে আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো হিসাব দেন না। বরং ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ট্রাস্টের সদস্যদের এড়িয়ে চলেন। এমনকি আমাদের অগোচরে তিনি রোহিঙ্গাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছেন। আমরা তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হাশেম স্থানীয় কিছু সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। নাগরিকত্ব জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম ও সম্ভাব্য উগ্রবাদী সম্পৃক্ততার অভিযোগ- সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে হাফেজ হাশেমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা হুবহু প্রকাশ করা হবে।