• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম :
শিশুর শৈশব রক্ষায় কলম হোক প্রতিরোধের হাতিয়ার চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর পেতে ঘুরতে হয় দ্বারে দ্বারে বনায়নের আড়ালে লুটপাটের সাম্রাজ্য, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগে বন কর্মকর্তা যাত্রীর ছদ্মবেশে পুলিশের কোটি টাকার ইয়াবা পাচার, রুখে দিলো বিজিবি উখিয়ায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ছিনতাই: পলাতক বাবুল, জড়িত আসিফ-ইমন, এলাকায় চাঞ্চল্য নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে উখিয়ায় বিএনপি কর্মীকে হত্যার উদ্যোশ্যে হামলা – দাবি পরিবারের লাইন নিয়ে চলছে নির্বিচারে পাহাড় কেটে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে খুরুশকুল বিট কর্মকর্তা মোশারাফ কক্সবাজারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী সাংবাদিকতা: জসিম উদ্দিনকে ঘিরে প্রশংসা, সামাজিক মাধ্যমে ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য পাচার ও মাসিক মাসোহারার বরপুত্র ডেপুটি রেঞ্জার সাদেক রোহিঙ্গা থেকে ‘নাগরিক’! দ্বৈত এনআইডি, হাফেজ হাশেমের গোপন সাম্রাজ্য

চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর পেতে ঘুরতে হয় দ্বারে দ্বারে

প্রতিবেদকের নাম : / ১৮৭ বার
সময় : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেশের একজন নাগরিকের মৌলিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অথচ সেই এনআইডির জন্য প্রয়োজনীয় ভোটার যাচাই-বাছাই ফরমে একটি স্বাক্ষর পেতেই দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

অভিযোগ উঠেছে, দালালের মাধ্যমে গেলে স্বাক্ষর মিললেও সরাসরি গেলে নানা অজুহাতে আটকে রাখা হচ্ছে ফাইল।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হক কোম্পানির বিরুদ্ধে এমনই অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

কারও অভিযোগ ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে মাসেরপর মাস,  কারও দাবি,চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর পেতে দালালের মাধ্যমে টাকা দিতে হয়েছে। আবার কেউ বলছে, ভোটার ফরমে স্বাক্ষর নিতে গেলে ফাইলই ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এভাবে একাধিক ব্যক্তি নানাভাবে অভিযোগের বর্ণনা দিয়েছেন প্রতিবেদককে।

অনেকেই বলছে, স্থানীয় নির্বাচনে চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়া বা তাদের সঙ্গে পারিবারিক-সামাজিক সম্পর্ক থাকার কারণেও কেউ কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সচেতন মহল বলছেন, জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য হাজারজন প্রার্থী থাকলেও জয়ী হবেন একজন। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে তিনি জনগণকে নাগরিক সেবা দেবেন।

সাধারণ মানুষের একেকজনের একেক প্রার্থীকে পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে, ভোট দেওয়া বা না দেওয়া- এসব ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু নাগরিক সেবা দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। কে কাকে ভোট দিয়েছেন, কে কাকে দেননি- সেই হিসাব করে দায়িত্ব পালন করা মোটেও কাম্য নয়।

তিনি যেই হোন না কেন, এসব করা দেশের সঙ্গে শত্রুতা, জনগণের সঙ্গে শত্রুতা এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে শত্রুতা করার শামিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেছেন, খুনিয়াপালং ইউনিয়নে দালাল চক্রের মাধ্যমে অসংখ্য রোহিঙ্গা এনআইডি কার্ড হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকায়। ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদেরকেও সেই দালাল চক্রের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ তৈরি করতেই চেয়ারম্যান আবদুল হক এসব নানা ফন্দি বের করেছেন।

৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা তোফাইল জানিয়েছেন, তার ছেলে সাগর আলীকে তিনি ভোটার করানোর জন্য যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে চেয়ারম্যান আবদুল হকের কাছে যাচাই-বাছাই ফরমে স্বাক্ষর নিতে গেলে প্রথমে তিনি কোনো কারণ ছাড়া অপারগতা প্রকাশ করেন।

পরে কারণ জানতে চাইলে যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগবে বলে ফাইল রেখে দেন চেয়ারম্যান। পরবর্তীতে সেই ফাইল মাস পার হয়ে গেলেও দেন না। স্বাক্ষরও দেন না, ফাইলও দেন না। এভাবে থাকতে থাকতে রামু উপজেলার ইউএনওকে তারা বিষয়টি অবগত করলে ইউএনও বিষয়টি তদারকি করতে ফাইলের এক কপি ফটোকপি করে তার কাছে দিতে বলেন। সেই ফাইল এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি বলে জানান ভুক্তভোগী তোফাইল।

তার ভাষ্যমতে, সামান্য একটি স্বাক্ষর, সেটি আমার ও ছেলের নাগরিক অধিকার। কোনো ব্যবসা বা কোনো ব্যক্তির কোনো সম্পত্তি তো নয়। এভাবে আজকাল বলে চেয়ারম্যান ফাইলটি রেখে দিলেন, স্বাক্ষর না দিয়ে।

তিনি আরও জানান, ইউএনও স্যারকে বিষয়টি জানিয়েছি, সব কাগজের ফটোকপিও দিয়েছি। এখন অপেক্ষা করতেছি, তিনি কী বলেন সেটা দেখার অপেক্ষা ।

 

মির্জালীর দোকান এলাকার ওয়াসিম নামের এক সিএনজি চালক বলেছেন, আমার ছেলেকে ভোটার করানোর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েছি। শেষে ভোটার যাচাই-বাছাই ফরমে স্বাক্ষর নিতে গেলে তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে পুরো ফাইলটি ছিঁড়ে ফেলেন। এখনো আমার ছেলে ভোটার হতে পারেনি।

ফাইল ছিঁড়ল কেন? আপনারা রোহিঙ্গা কি না? প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াসিম বলেন, আমি রোহিঙ্গা হলে আমাকে ক্যাম্পে দিয়ে আসতে বলেন। আমি তো আমার বাপ-দাদার খতিয়ানভুক্ত বাংলাদেশি নাগরিক।

চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আমি রোহিঙ্গা, তাহলে আমাকে বলতে বলেন, আমি ক্যাম্পে চলে যাব।

তাহলে আপনার ছেলের ভোটার ফাইল ছিঁড়ল কেন? এমন প্রশ্নে বলেন, আমি বর্তমান চেয়ারম্যানের প্রতিদন্ধী প্রার্থীর পক্ষে ভোট করেছিলাম। এটাই আমার অপরাধ।

আমার পছন্দের প্রার্থীকে আমি ভোট দিব, এটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। ইউনিয়ন পরিষদে যে চেয়ারম্যান পদে বসবেন, সে জনগণের সেবা দিবে, সেটি নাগরিক অধিকার। এখন এই চেয়ারম্যান আমাদের নাগরিক অধিকার হরণ করছেন।

১নং ওয়ার্ডের দারিয়ারদীঘি রাস্তার মাথা এলাকার সাঈদ শিশির নামের এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, আমি একটি এনজিওতে চাকরি করি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে আমাকে ১৪ বার পরিষদে আনা হয়েছে। তারপরও ভোটার যাচাই-বাছাই ফরমে আমাকে স্বাক্ষর দেয়নি। আমি কারও পক্ষ বা বিপক্ষে কোথাও ছিলাম না।

আমার অপরাধ, আমার বড় ভাই এই চেয়ারম্যানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য ভোট করেছিল।

৩নং ওয়ার্ডের মির্জালীর দোকান এলাকার দৌলত নামে আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান আবদুল হক আমার পরিবারের এক সদস্যকে প্রায় ২ মাস ঘুরিয়েছে ভোটার ফরমে স্বাক্ষর দিতে। পরবর্তী সময়ে দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করিয়ে নির্বাচন অফিসে জমা দিয়েছে।

কালাম নামে আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, আমার ভাই নুরুল আলমকে ভোটার করাতে যখন স্বাক্ষর পাচ্ছিলাম না, তখন দালালের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকায় সেই স্বাক্ষর নিয়ে ভোটার করাতে হয়েছে।

০৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আসলে এরকম তো আমি শুনি নাই। তবে অফিস বন্ধ থাকা কালীন সময়ে স্বাক্ষর না নিতে শুনেছি। সবকিছু বন্ধ থাকলে স্বাক্ষর নিয়ে কী করবে-এরকম একজনকে বলতে শুনেছি।

৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন বাবুলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান একটু প্রতিহিংসাপরায়ণ। ফলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত প্রার্থীর কোনো পরিচিত বা আত্মীয়স্বজন এবং যারা তার জন্য ভোট করেছিল, তাদেরকে এসব হয়রানি করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, এটা বাস্তব।

তাছাড়া, আমার ওয়ার্ডে কোনো উন্নয়নও করেনি চেয়ারম্যান। অথচ আমি নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি। আমার থেকে এলাকার মানুষ অনেক কিছু প্রত্যাশা করে, সেটি পর্যন্ত পূরণ করতে দেয়নি আমার চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে আমি নিজে লিখিত অভিযোগও দিয়েছি ইউএনও বরাবর।

 

৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ বিদ্যুৎ বলেছেন, খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদে যারা যায়, তারা নিজেদের বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করেন। এটি যে জনগণের সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, সেটি সবাই ভুলে যায়। যে যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু তারা চেয়ারে বসলে কে ভোট দিছে, কে দেয়নি, সেটা নিয়ে পড়ে থাকে। এটাই আসল সমস্যা।

এমনকি আমার ৫নং ওয়ার্ডে বিগত ৫ বছরে এক টাকার উন্নয়নও করেনি বর্তমান চেয়ারম্যান। এত বৈষম্য আর অবহেলায় আমার ওয়ার্ডের জনগণ ৫ বছর পার করে দিছে।

এসকল বিষয়ের ওপর অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা। আমি কাউকে এরকম হয়রানি করিনি। কেউ যদি এরকম প্রমাণ দিতে পারে, আমি চেয়ারম্যানি ছেড়ে চলে যাব, কথা দিলাম।

রামু উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান অসুস্থতার কারণে এ বিষয়ে মন্তব্য দিতে পারেননি। তবে, তিনি সুস্থ হলে এ বিষয়ে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর