একটি অল্প বয়সী মেয়ের হাতে বই থাকার কথা, অথচ সেই হাতে উঠে আসে সংসারের দায়িত্ব। স্কুলে যাওয়ার কথা যে শিশুটির, জীবিকার তাগিদে তাকে ছুটতে হয় কর্মস্থলে। আবার নানা কারণে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন থেমে যায় মাঝপথে। শিশুর এমন হারিয়ে যাওয়া শৈশব ঠেকাতে গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী ও অনুসন্ধানী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
তারা বলেছেন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এগুলো শিশু অধিকার বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। এসব প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোববার ( ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) কক্সবাজারের ইউনি রিসোর্ট হোটেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ আয়োজিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ামুক্ত কক্সবাজার জেলা গঠনে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের করণীয়’ শীর্ষক এ কর্মশালায় কক্সবাজারের শিশু অধিকার পরিস্থিতি, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার কারণ এবং এসব প্রতিরোধে গণমাধ্যমের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
একটি শিশুকে স্কুলে ধরে রাখা মানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষা করা নয়,বরং একটি পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা।
বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে পরিবারকে উৎসাহিত করা এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাগত বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কক্সবাজার এরিয়া কোর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিক বলেন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, যুব, শিশু ও কিশোর-কিশোরী, স্থানীয় সংগঠন, সিবিও এবং সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে আসছে।
কর্মশালায় বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার বর্তমান ও অতীত পরিস্থিতি এবং এসব সমস্যা প্রতিরোধে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির চাইল্ড সেইফটি নেট প্রকল্পের ম্যানেজার সাগর ডি’ কস্তা।
নারী ও শিশু বিষয়ক সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং সংবাদ পরিবেশনে বিবেচ্য বিষয় নিয়ে সেশন পরিচালনা করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল অফিসের ইন্টারনাল ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ম্যানেজার দেবাশীষ রঞ্জন সরকার।
অন্যদিকে সাংবাদিকতার অনুসন্ধানমূলক দক্ষতা, কৌশল এবং অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে সংবাদে তুলে ধরা যায়,সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম। পরে উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
কর্মশালার বিশেষ আকর্ষণ ছিল দলীয় কাজ। এতে সাংবাদিকরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বন্ধে গণমাধ্যম কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে নিজেদের মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় ও মডারেশন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপজেলা কোর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়া এবং কমিউনিকেশনস স্পেশালিষ্ট বিপ্লবী রানী দে রায়।
বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দরিদ্র পরিবারকে সুদমুক্ত ঋণ, আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ ও নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি মেয়েশিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে মাসিক বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।
এছাড়া মেয়েশিশুদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সক্ষমতা বাড়াতে স্কুলভিত্তিক মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়াতে জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রমও পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
কর্মশালায় বক্তাদের প্রত্যাশা,সংবাদ শুধু ঘটনার বিবরণ হবে না; একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্পও তুলে ধরবে। আর সেই গল্পই তৈরি করবে সচেতনতা, জাগাবে সামাজিক প্রতিরোধ।